ক্রিকেট মানচিত্রে জম্মু-কাশ্মীরের স্বপ্নের উত্থান, রঞ্জি থেকে বিদায় বাংলার

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা, ১৮ ফেব্রুয়ারি: তীরে গিয়ে তরী ডুবল বাংলা’র। আরও একবার স্বপ্নের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে শেষ হয়ে গেল রঞ্জি অভিযান। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে ইনিংসে জয়। ঝড়ের গতিতে এগোচ্ছিল লক্ষ্মীরতন শুক্ল’র বাংলা। যে ভাবে বাংলা একের পর এক প্রতিপক্ষ’কে নাস্তানাবুদ করে এগিয়ে গিয়েছিল তাতে সাফল্য শুধু সময়ের অপেক্ষা, মনে করছিলেন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

একইসঙ্গে সেমিফাইনালে যখন প্রতিপক্ষ হিসাবে জম্মু-কাশ্মীর’কে পেল বাংলা এবং তা-ও আবার কল্যাণীতে, তখন অতি বড় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞও আশা করেননি ঘরের মাঠে নাস্তানাবুদ হতে হবে অভিমন্যু ঈশ্বরণ’দের। দু’ঘণ্টার এক সেশনের খারাপ ব্যাটিং গোটা মরসুমের ভাল পারফরম্যান্সে চোনা ফেলে দিল।

ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৩২৮ রান তোলে বাংলা। ১৪৬ রানের দুর্ধর্ষ ইনিংস খেলেন সুদীপ কুমার ঘরামী। সুদীপ ছাড়া অভিমুন্য ঈশ্বরণ করেন ৪৯ রান। টপ অর্ডারে এই দুই ব্যাটসম্যান ছাড়া আর কেউ রান পাননি। বরং লোয়ার অর্ডার অনেক বেশি ভরসা যুগিয়েছে। বাংলার ইনিংসকে ৩০০ রানার গণ্ডি টপকাদের সাহায্য করেন সুমন্ত গুপ্ত (৩৯) এবং শাহবাজ আহমেদ (৪২)।

জম্মু-কাশ্মীরের হয়ে পাঁচ উইকেট নেন আকিব আহমেদ ডার। এ ছাড়া তিন উইকেট নেন সুনীল কুমার।

সেমিফাইনালের নিরিখে এই রান আহামরি না হলেও বাংলার তুলনায় শক্তিশালী বোলিং লাইন চলতি রঞ্জি ট্রফিতে অংশ নেওয়া আর কোনও দলের নেই। বাস্তবের জমিতে তার প্রতিফলনও দেখা যায়। জম্মু-কাশ্মীরের ইনিংসের একাই আট উইকেট তুলে নেন মহম্মদ শামি। লামির আগুনে গতি এবং নিখুঁত লাইন এবং লেন্থের কোনও জবাব ছিল না উপত্যকার দলটির ব্যাটসম্যানদের কাছে। এছাড়া দুই উইকেট নিয়েছিলেন মুকেশ কুমার। ২৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলার ইনিংস।

প্রথম ইনিংসেই যেভাবে বাংলার টপ অর্ডারে ঘরামি এবং ঈশ্বরণ ছাড়া বাকিরা নাকানিচোবানি খেয়েছেন সেখানে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ের উপর অনেক কাজ করতে হবে তা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। সুদীপ ঘরামি রোজ রোজ একা দলকে জেতাবেন এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। এছাড়া কোন একজন ব্যাটসম্যানের লাগাতার একটা দলকে টেনে নিয়ে চলা সম্ভব নয়। কোয়ার্টার ফাইনালেও সুদীপের ব্যাটের উপর ভর করেই বৈতরণী পার করেছিল বাংলা।

দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু থেকেই নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে উইকেট হারায় বাংলা। কোনও ব্যাটারই চেনা পিচে দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পারলেন না। সুদীপ চট্টোপাধ্যায় রানের খাতাই খুলতে পারেনি। রান পাননি সুদীপ ঘরামিও‌। অনুষ্টুপ মজুমদার করেন ১২ রান, নাইট ওয়াচম্যান হিসেবে সুরজ সিন্ধু জয়সওয়াল’কে পাঠালেও তিনি ১৪ রানের বেশি করতে পারেননি। সুমন্ত গুপ্ত করেছেন ৮ রান এবং শাকির হাবিব গান্ধী করেন ১০ রান। অধিনায়ক অভিমন্যু ঈশ্বরণ (৫) দুই অঙ্কের রানে পৌঁছতে পারেননি। মূলত বাংলা’র ব্যাটসম্যান’রা মাঠে নেমেছেন এবং সাজঘরে ফিরে গিয়েছেন। এমন বিপর্যয়ের মধ্যে কিছুটা চেষ্টা করেন শাহবাজ় আহমেদ। ২৪ রান এসেছে অলরাউন্ডারের ব্যাট থেকে। তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। ৯৯ রানে অল আউট হয়ে যায় দল। জম্মু-কাশ্মীরের সামনে লক্ষ্য ছিল ১২৬ রান। জম্মু কাশ্মীরের হয়ে চারটি করে উইকেট নেন আকিব নবি ডার এবং সুনীল কুমার।

নূন্যতম রান তুলে প্রথমবারের জন্য ফাইনালে পৌঁছতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি জম্মু-কাশ্মীরকে। মাত্র চার উইকেট হারিয়ে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয় আব্দুল সামাদ পারশ ডোগরার দল। ১২ রানে দুই উইকেট হারিয়ে প্রাথমিকভাবে ম্যাচে জাঁকিয়ে বসার চেষ্টা করলেও তাতে কোন সুবিধা করতে পারেনি বাংলা। এত কম রানে প্রতিপক্ষ যতই দুর্বল হোক রুখে দেওয়া মুশকিল। বুধবার জম্মু-কাশ্মীরের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৮৩ রান। হাতে ছিল ৮ উইকেট। দিনের শুরুতে ২ উইকেট তুলে নেন আকাশদীপ। কিন্তু বংশরাজ শর্মা ও আব্দুল সামাদকে আউট করতে পারলেন না মহম্মদ শামিরা। যার ফলে প্রথমবার রঞ্জি ট্রফি সেমিফাইনালে খেলা জম্মু-কাশ্মীরের বিরুদ্ধে বাংলার ৬ উইকেটে হার।

জম্মু-কাশ্মীর যখন ইতিহাস তৈরি করে প্রথমবারের জন্য রঞ্জি ট্রফি সেমিফাইনাল থেকে ফাইনালে পৌঁছে গেল সেখানে বিগত বছরগুলিতে কৌলিন্য এবং ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাংলা দলের প্রাপ্তি শুধুই হতাশা। ২০১৯-২০ মরসুমে রঞ্জি ফাইনালে পৌঁছেও অধরা রয়ে যায় খেতাব। ২০২২-২৩ মরসুমেও বাংলা ফাইনাল খেলে এবং দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে। এই মরসুমেও স্বপ্নের দৌড় সমাপ্ত হয়ে গেল স্রেফ দুই দু’ঘণ্টার কিছু বেশি সময় একটা সেশনের রাশ হারিয়ে। প্রথম বার রঞ্জির ফাইনালে ওঠার পর জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটারদের উল্লাস ছিল দেখার মতো। গত কয়েক মরসুমে এই দলের উত্থান স্বপ্নের মতো। সারা বছর সেখানে ক্লাব ক্রিকেট হয় না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খেলেন তাঁরা। কিন্তু পারশ ডোগরার এই দল দেখিয়ে দিল, শক্ত প্রতিপক্ষকেও সহজে হারাতে পারে তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here